সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে যমুনার বালু ঘিরে জমে উঠেছে বাণিজ্য। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা বালুর পয়েন্ট থেকে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ভারী ড্রাম ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে বালু।
এতে একদিকে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, অন্যদিকে অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সড়ক। বালুর ধুলায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষও। আর এই জনদুর্ভোগের মধ্যেই কাজিপুরের বালুমহাল ও বালু পরিবহন নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কাজিপুরের বিভিন্ন সড়কে বালুবাহী ট্রাক চলাচল করলেও এর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সরকার পরিবর্তনের পর বালুর পয়েন্ট ও ভারী বালুবাহী ট্রাকের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমানে উপজেলার বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে দিন-রাত অবাধে চলছে এসব ট্রাক।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাজিপুরের একাধিক বাসিন্দার দাবি, বালুর ব্যবসা ও বিভিন্ন বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এখন স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের নেতাকর্মীদের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। সরকারি নিয়মে ইজারা দেওয়া বালুমহালের পাশাপাশি ইজারার বাইরে বিভিন্ন স্থান থেকে বালু উত্তোলন ও বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুমহাল ও বালু পরিবহনকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থের লেনদেন হচ্ছে। স্থানীয় বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের একটি অংশ এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সুবিধা পাচ্ছেন-এমন অভিযোগও করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
তবে এসব অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ স্থানীয় অভিযোগকারীরা প্রকাশ করেননি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘আগে এত বেশি বালুর ট্রাক দেখা যেত না। এখন দিন-রাত বড় বড় ট্রাক চলছে। এতে সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে গেছে। কারা এসব নিয়ন্ত্রণ করছে, প্রশাসনের উচিত সেটা খুঁজে বের করা।’
আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাহলে সেটা তদন্ত হওয়া দরকার। আমরা কোনো দলের বিরুদ্ধে নই; আমরা চাই সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বন্ধ হোক।’
বালুবাহী ট্রাকের অবাধ চলাচলে ইতোমধ্যে ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনাও। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) ভোরে সিরাজগঞ্জ-কাজিপুর মহাসড়কের শিমুলদাইড় এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় নুরজাহান আক্তার নামে এক নারী নিহত হন। এর আগে ১৭ জুলাই কাজিপুর উপজেলার পাটাগ্রাম রোড এলাকায় বালুবাহী ট্রাকের চাপায় বাদশা মিয়া নামে এক ভ্যানচালক নিহত হন।
স্থানীয় ভ্যানচালকদের ভাষ্য, বড় বড় ড্রাম ট্রাকের কারণে সড়কে ছোট যানবাহন নিয়ে চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিপরীত দিক থেকে ভারী ট্রাক এলে অনেক সময় নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কায় থাকতে হয় তাদের।
অতিরিক্ত ভারী যানবাহনের চাপে কাজিপুরের বিভিন্ন আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কোথাও সৃষ্টি হচ্ছে খানাখন্দ, কোথাও উঠে যাচ্ছে সড়কের পিচ। এতে যানবাহন চলাচলের পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে বালুবাহী ট্রাক চলাচলের সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে বালু ও ধুলা। এতে অনেক এলাকায় সড়ক ও আশপাশের পরিবেশ ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। পথচারীদের নাক-মুখ ঢেকে চলাচল করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে বালুর পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে অর্থদণ্ড করা হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না। অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও শুরু হচ্ছে বালু পরিবহন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন- বালুমহাল ইজারা, বালু উত্তোলন, পয়েন্ট পরিচালনা ও পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া কারা নিয়ন্ত্রণ করছে? ইজারার বাইরে কোথাও বালু উত্তোলন বা বিক্রি হচ্ছে কি না? আর এসব কর্মকাণ্ডে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি না?
কাজিপুরের সাধারণ মানুষের দাবি, দল-মত নির্বিশেষে বালুমহাল ও বালু পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হোক। ইজারার শর্ত লঙ্ঘন, অনুমোদনবিহীন বালু উত্তোলন কিংবা অবৈধ পয়েন্ট পরিচালনার প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
একই সঙ্গে স্থানীয় বিএনপির যে অংশের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তাদের ভূমিকা তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কাজিপুরবাসীর বক্তব্য, বালু কার- কোন দলের, কোন ব্যক্তির- তা তাদের বিষয় নয়। তাদের দাবি একটাই; বালুর ব্যবসার কারণে যেন মানুষের জীবন, সড়ক ও পরিবেশ জিম্মি না হয়।