ঢাকা    বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম নিউজ

'আমার বাচ্চাগুলোরে একটু বাঁচান, রোদের তাপে পুড়ে যাবে'

রোদের তাপে বারবার কেঁদে উঠছে পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা খাতুন। হয়তো সে জানে না সীমান্ত কী, জানে না রাষ্ট্রের সংজ্ঞা। সে শুধু জানে মায়ের বুকের উষ্ণতা। কিন্তু সেই মা সুমি খাতুনও যেন অসহায়। কোলের শিশুকে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, আর নিজের চোখের জল লুকানোর।একদিকে বাংলাদেশ, অন্যদিকে ভারত। মাঝখানে কয়েক গজের শূন্যরেখা। সেই শূন্যরেখাতেই একই পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ৯ জন মানুষ আটকে আছেন। রোববার ভোর থেকে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া ও ভন্দুরচর সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তবে বিজিবির বাধার মুখে তারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারেননি।অনিশ্চয়তার ভার যেন সবচেয়ে বেশি এসে পড়েছে পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা আর চার বছরের ফাতেমা খাতুনের ওপর। ছোট বোনের কান্না থামছে না। বড় বোন ফাতেমাও ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে বারবার কাঁদছে। দুই মেয়ের এমন অসহায় অবস্থা দেখে মা সুমি খাতুনের বুক ফেটে যাচ্ছে। কখনো ছোট মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরছেন, কখনো বড় মেয়ের চোখের পানি মুছে দিচ্ছেন। কিন্তু একজন মা হয়েও যেন কিছুই করতে পারছেন না।পাশেই দাঁড়িয়ে বাবা বিল্লাল। তাঁর মুখে কোনো ভাষা নেই। শুধু অসহায় দৃষ্টিতে কখনো সন্তানদের দিকে, কখনো সীমান্তের ওপারে তাকিয়ে থাকছেন। হয়তো একজন বাবার সবচেয়ে বড় কষ্ট এটাই—সন্তানের কান্না শুনেও কিছু করতে না পারা।মাথার ওপর তপ্ত সূর্য। কোথাও কোনো ছাউনি নেই। রোদের তীব্রতা থেকে বাঁচতে ফাহিম ও হিমেল নিজেদের পরনের লুঙ্গি খুলে অস্থায়ী ছাউনি বানানোর চেষ্টা করছেন। সেই সামান্য ছায়াতেই একটু স্বস্তি খুঁজছে শিশুরা।খবর পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারাও সীমান্তে ছুটে আসেন। বিজিবির সদস্যদের সঙ্গে তারাও অবস্থান নেন। রোববার বেলা ১১টার দিকে দুই দেশের কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের পক্ষে দাঁতভাঙ্গা বিজিবি ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার ঠান্ডু মিয়া এবং ভারতের ১৮৩ ব্যাটালিয়নের ঝালোরচর ক্যাম্পের ইন্সপেক্টর প্রদীপ কুমার আলোচনায় অংশ নেন। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনা শেষে কোনো সমাধান আসেনি।এপারে বিজিবি, ওপারে বিএসএফ। দুই বাহিনীর সদস্যরা নিজ নিজ অবস্থানে। মাঝখানে ক্ষুধা, ক্লান্তি আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে ৯টি জীবন।সীমান্তে উপস্থিত অনেকের চোখেও জল। কারণ রাষ্ট্রের সীমারেখা মানুষ টানে, কিন্তু শিশুর কান্নার কোনো সীমান্ত নেই। পাঁচ মাস বয়সী ফাহিমা জানে না সে কোন দেশের নাগরিক। চার বছরের ফাতেমাও জানে না কেন তাকে খোলা আকাশের নিচে বসে থাকতে হচ্ছে। তারা শুধু জানে, তাদের ক্ষুধা লেগেছে, তাদের রোদ লাগছে, তারা মায়ের কোলে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে চায়।সোমবার দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। বারবার হয়েছে আলোচনা, সীমান্তে এসেছে গাড়ি, কিন্তু মেলেনি কোনো সমাধান। তাই দ্বিতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে, বিছানাহীন ঘাসের ওপরই রাত কাটাতে হচ্ছে ৯ জনকে। তাদের অসহায় মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে মানবিক কারণে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন স্থানীয়রা।হয়তো ইতিহাস সীমান্ত বিরোধের কথা মনে রাখবে। কিন্তু রৌমারীর এই শূন্যরেখায় বসে থাকা দুই শিশুর কান্না, এক বাবার নীরবতা আর এক মায়ের অশ্রু—সেটিও একদিন মানবতার কাছে প্রশ্ন হয়ে থাকবে।রাষ্ট্রের সীমানা আছে, কূটনীতির হিসাব আছে, কিন্তু মানবতার কি কোনো শূন্যরেখা আছে?

'আমার বাচ্চাগুলোরে একটু বাঁচান, রোদের তাপে পুড়ে যাবে'